Phone: 085158370
Email: bbariabar@gmail.com

ইতিহাস ও ঐতিহ্য

তদানিন্তন বৃটিশ সরকারের আমলে ১৮৭৫ খ্রি. ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎপর ১৮৭৮ খ্রি. ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বর্তমান পৌরসভার পুকুরের (যা কাচারি পুকুর নামে খ্যাত) উত্তর পার্শ্বে বৃটিশ সরকার কর্তৃক ১টি বৃহৎ একতলা দালান নির্মাণ করে। উক্ত দালানটি আদালত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার দেওয়ানী ফৌজাদারী বিচার কার্য দালানে চালু করা হয়। যা ১৯৯৫ খ্রি. পর্যন্ত বিচার কার্য পরিচালনা হয়। পরবর্তিতে উক্ত দালান অতি পুরাতন হওয়ার কারণে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়। যার দরুণ সরকার গণপূর্ত বিভাগ কর্তৃক উক্ত দালানটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করিলে সরকারিভাবে উক্ত পুরাতন আদালত ভবন Demilosh করা হয়। উক্ত আদালত ভবনের পশ্চিম দিকে কোণে রাস্তার দক্ষিণ দিকে পশ্চিম কাণে ১টি দালান নির্মাণ ক্রমে আদালতে বিচার কাজে সহায়তাকারী তৎকালীন মুক্তার সাহেব মোহরারদের (আইনজীবী সহকারী) জন্য একটি পৃথক দালান বৃটিশ সরকার কর্তৃক নির্মাণক্রমে মুক্তার মোহরারদের বসার ব্যবস্থা করা হয়। সেই দালানের অর্ধেক অংশে মুক্তার সাহেবগণ বসতেন, অবশিষ্ট অর্ধেক অংশে মোহরার (আইনজীবী সহকারী) সাহেবগণ বসতেন। দালানটিকে মুক্তার লাইব্রেরী বলা হত। পরবর্তিতে উক্ত মুক্তার লাইব্রেরির জায়গাটি আইনজীবী সমিতি বিক্রি করে দেয়। সেই স্থানে বর্তমানে মডেল প্লাজা নামে ১টি বহুতল বিশিষ্ট বিল্ডিং আছে।


সেই সময় মুক্তার লাইব্রেরি সম্মুখে একটি প্রাচীন বটবৃক্ষ ছিল। যা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাচারি বটগাছ নামে খ্যাত। এই বটগাছটি নিয়ে অনেক কিংবদন্তি চালু আছে। উক্ত বটপবৃক্ষটি বয়সের কারণে ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হলে এক সময় ধ্বংস হয়ে যায়। মুক্তার লাইব্রেরিই ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতির ঐতিহাসিক ভিত্তি।


সর্বপ্রথম এই মুক্তার লাইব্রেরিকেই কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমায় বিচারপ্রার্থী লোকজন আইনসেবা গ্রহণ করত। পরবর্তিতে আইনজীবী সমিতি ভবন বা আইনজীবী সমিতি অফিস নির্মাণের লক্ষ্যে ১৮৮৭ খ্রি. ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন স্বনামধন্য আইনজীবী সর্বজনাব বাবু রামকানাই দত্ত, ভারত চন্দ্র ভট্টাচার্য/বিদ্যানিধি, আবুল ওয়াজিদ জহুরুল হক, মহেশচন্দ্র দেব, আব্দুর রউফ, অখিলচন্দ্র দত্ত, দীনবন্ধু দত্ত, দৌলত খান মুন্সি, কামিনীকুমার ভট্টাচার্য, গোলাম ছামদানী খাদেম, উমানাথ দত্ত, কৈশাল দেবরায়, নরেশচন্দ্র নন্দী, কাশীনাথ ভট্টাচার্য, মোতাহের আলী, বিপিনচন্দ্র দত্ত, অম্বিকা হালদার, অপূর্ব কাঞ্চন নন্দী, সৈয়দ ফজলুর রহমান, উমাচরণ নাগ, মহিম ভট্টাচার্য প্রমুখ আইনজীবীগণ পুরাতন আদালত ভবনের পূর্ব দক্ষিণ দিকে এবং পুরাতন কাচারী পুকুরের উত্তর পূর্বদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের প্রধান রাস্তার পূর্ব দিকে বর্তমানে সিটি সেন্টার নামে যে মার্কেট বিদ্যমান আছে স্থানে বর্ণিত আইনজীবীগণ তাদের নিজস্ব অর্থায়নে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতির জন্য খরিদ করে সেখানে ১টি খড়ের ছাউনিযুক্ত গৃহ (ছনের ঘর) নির্মাণ করে তথায় স্বাধীনভাবে আইনজীবীগণ আইন পেশা পরিচালনা করতে থাকে। পরবর্তিতে আইনজীবীরা সেই স্থানে খড়ের গৃহ অপসারণ করে ১টি পাকা ১তলা দালান নির্মাণ করেন। তারপর থেকে উক্ত ১তলা দালানে আইনজীবীরা স্বাধীনভাবে আইনসেবা পরিচালনা করতে থাকেন।


উল্লেখিত দালানে আইনজীবী সমিতির ১টি আইন বইয়ের লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৭১ খ্রি. ২৬ মার্চ স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশিষ্ট আইনজীবী আলী আজম  ভূঁঞা, পরবর্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশের এমপি গভর্নর। সাবেক সভাপতি বিশিষ্ট আইনজীবী সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট লুৎফুল হাই সাচ্চু (পরবর্তিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া- থেকে নির্বাচিত এমপি), সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ এমদাদুল বারী (সাবেক গণ-পরিষদ সদস্য পরবর্তিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক) প্রমুখ আইনজীবীগণ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজ করায় এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন মিটিং করায় এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতিতে অ্যাডভোকেট আলী আজম ভূঁইয়ার নির্দেশে সমিতির ক্লার্ক বাবু সুশীলচন্দ্র কর ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতি হতে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশ পতাকা উত্তোলন করে। যার ফলে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতির সম্পূর্ণ তলা ভবন সমিতির মহামূল্যবান প্রায় ৬০০০ (ছয় হাজার) এর বেশি আইন বই এবং অতিগুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলে। যার ফলে ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। তখন কেবল খালি ভিটিটুকুই অবশিষ্ট থাকে।


পরবর্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতির সদস্যরা আইন পেশা পরিচালনায় মারাত্মক অসুবিধার মধ্যে পড়ে। তদবস্থায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতির সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশিষ্ট আইনজীবী রাজনীতিবিদ আলী আজম ভূঁইয়ার নেতৃত্বে অ্যাডভোকেট সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট লুৎফুল হাই সাচ্চু, অ্যাডভোকেট সৈয়দ কে এম এমদাদুল বারী এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় জাতির জনক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নিকট হতে সরকারী আর্থিক সাহায্য আনা হয়।


পরবর্তিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হামিদুর রহমান () সম্পাদক (প্রশাসন) অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক চৌধুরীর অক্লান্ত পরিশ্রমে পুড়িয়ে যাওয়া স্থানে নতুন ১টি বিল্ডিং নিমাণক্রমে আইনজীবী সমিতির ভবন পুঃন চালু করেন। অ্যাডভোকেট সুরেশচন্দ্র মল্লিক আইনজীবী সমিতির ক্লার্ক বাবু সুশীলচন্দ্র কর অক্লান্ত পরিশ্রম করে আগরতলা দিয়ে কলকাতা গিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট বার এসোসিয়েশন হতে তাদের দেওয়া বিভিন্ন মহামূল্যবান গুরুত্বপূর্ণ আইন বই এনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইন সমিতির লাইব্রেরী পুঃন প্রতিষ্ঠা করেন।


পরবর্তিতে ১৯৮৪ খ্রি. ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা জেলাতে উন্নীত করা হলে ১৫/০২/৯৮৪ খ্রি. ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতি জেলা আইনজীবী সমিতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া হিসেবে উন্নীত হয়, এবং পরবর্তিতে তৎকালীন সরকারের নির্দেশনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জজ কোর্ট এবং ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট বর্তমান কাউতলি স্থানান্তরিত হলে জেলা আইনজীবী সমিতি সাবেক কোর্ট রোড হতে স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমান স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়।


সূত্র জেলা আইনজীবী সমিতির সংবিধান জেলা আইনজীবী সমিতির শতবর্ষ উপলক্ষ্যে প্রকাশিত সংকলন এবং সিনিয়র অ্যাডভোকেট সাবেক সভাপতি সাধারণ সম্পাদক একে শামসুদ্দিন সাহেবের।